কলাপাড়ায় ১৫ কোটি টাকা মূল্যের জমি নিয়ে- জাল রায় দিয়ে নামজারী ॥

217

রাসেল কবির মুরাদ , কলাপাড়া প্রতিনিধি ঃ

কলাপাড়া সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের জাল রায়-ডিক্রী দিয়ে কুয়াকাটার প্রায় পনেরো কোটি টাকা মূল্যের ৫.৭০ একর ভূমি নামজারী করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া কুয়াকাটা পর্যটন এলাকায় সরকারী খাল ও জলাশয় দখল সহ অননুমোদিত বহুতল ভবন নির্মানে বাঁধা না দিয়ে পরোক্ষভাবে সহায়তা প্রদানের অভিযোগ উঠেছে মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তারপরও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বলছেন মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানা যায়, উপজেলার আলীপুর বন্দরের জনৈক আবুল হোসেন মোল্লা কলাপাড়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে জেএল-৫৭, মৌজা-কুয়াকাটা এর ৬৭৭, ৬৮১, ২৯৯, ৮৬৮ খতিয়ানের মোট ৫.৭০ একর ভূমি ২৩৫/১৭, ২৩৬/১৭ দেওয়ানী মোকদ্দমার রায়-ডিক্রী মূলে রেকর্ড সংশোধনের (৭২৬-কলা/২০১৮-২০১৯) আবেদন করেন। এরপর কলাপাড়া এসি ল্যান্ড এ এফ এম আবু সুফিয়ান ১৪ অক্টোবর ২০১৮ মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামকে সরেজমিন তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। উক্ত আদেশের প্রেক্ষিতে মহিপুর সহকারী ভূমি কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ভূমি সম্পর্কিত প্রকৃত তথ্য গোপন করে ২৫ অক্টোবর এবং কানুনগো মো: আলতাফ হোসেন ৩০ অক্টোবর ২০১৮ নামজারীর সুপারিশ করেন। পরবর্তীতে ১ নভেম্বর ২০১৮ এসি ল্যান্ড’র আদেশ বলে ২৩৫/১৭, ২৩৬/১৭ দেওয়ানী মোকদ্দমার সোলে সূত্রে প্রাপ্ত দেখিয়ে মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম নভোদয় হাউজিং সহ চারজনের নামের রেকর্ড থেকে ৫.৭০ একর ভূমি কর্তন করে মোসা: ফাতেমা বেগম, সালমা বেগম, আইরিন জেসমিন, আবুল হোসেন মোল্লা ও আমিনুল ইসলাম’র নামে রেকর্ড সংশোধন পূর্বক ১৪৩৭ নম্বর নতুন খতিয়ান সৃজন করেন। এতে দেওয়ানী ২৩৫/১৭, ২৩৬/১৭ মামলার বিবাদী পক্ষ সংক্ষুব্ধ হয়ে আদালতের চলমান মামলার জাল রায় এবং একতরফা আদেশকে ডিক্রী দেখিয়ে মূল্যবান ৫.৭০ একর ভূমি নামজারির বিষয়টি ২৯ নভেম্বর ২০১৮ বিজ্ঞ কলাপাড়া সিনিয়র সহকারী জজ মো: কামাল খানের আদালতের নজরে আনলে বিজ্ঞ আদালত সন্তুষ্ট হয়ে উক্ত জাল জালিয়াতির বিষয়ে সকল প্রমানাদি সহ সুনির্দিষ্ট দরখাস্ত করতে বলেন। এরপর সংক্ষুব্ধ পক্ষ উক্ত নামজারিকৃত ভূমির ক্রয়-বিক্রয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা সহ আদালতের জাল রায় সৃষ্টির বিষয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ গ্রহনের প্রার্থনা করেন। বিজ্ঞ আদালত শুনানী শেষে আইনী পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেছেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, কলাপাড়া সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে প্রাকটিসরত আইনজীবীরা আদালতের চলমান মামলার রায় জালিয়াতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং এর সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবী করেন। কেননা ২৩৫/১৭ বন্টনের মামলাটি চলমান আছে, বিজ্ঞ আদালত কোন রায় প্রদান করেননি। এছাড়া ২৩৬/১৭ নাদাবী দলিল বাতিলের মামলাটিতে একতরফা রায় হওয়ার পর সংক্ষুব্দ পক্ষ ১৪/১৮ সানি মামলা করেছেন এবং এটির মূল মামলা ১২/০৭ উচ্চ আদালতে শুনানীর জন্য আছে।
কলাপাড়া সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো: ইলিয়াস জানান, ’দেওয়ানী মোকদ্দমা ২৩৫/১৭ আদালতে চলমান আছে। এটির কোন রায় হয়নি।’ আদালতের সেরেশতাদার ও নকল প্রদান তুলনাকারী মো: কুদ্দুছ জানান, ’উক্ত রায় আদেশ’র কপিটি জাল। মামলাটি চলমান আছে, এখনও রায় হয়নি। আদালতের জাল রায় দিয়ে ভূমি অফিসে নামজারি করার বিষয়টি আদালতের নজরে এসেছে, যা আদেশের জন্য আছে। এছাড়া ভূমি অফিসের ওই নামজারী কেসের নথিটিও বিজ্ঞ আদালতে তলব করে আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।’
নামজারীতে সংক্ষুব্ধ পক্ষের প্রতিনিধি মো: বাবুল খান জানান, ’৫৭ নং কুয়াকাটা মৌজার বিএস ১৪৭ নং খতিয়ানে আমাদের কয়েকজনের রেকর্ডীয় সম্পত্তি থেকে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ৫.৭০ একর ভূমি একটি প্রভাবশালী মহল অন্যায় ভাবে মহিপুর তহশিলদার রফিকুল ইসলাম ও কলাপাড়া ভূমি অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় নামজারী করে। যা আমরা জানার পর উক্ত নামজারী বাতিল চেয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আদালতে মিস কেস-১০/১৮ দায়ের করেছি, যা ২রা জানুয়ারী ২০১৯ শুনানীর জন্য ধার্য আছে। কলাপাড়া সিনিয়র সহকারী জজ আদালতেও আমরা বিজ্ঞ আদালতের সীল মোহর নকল করে জাল রায় সৃষ্টির বিষয়টি জানিয়েছি। আমরা সকল সার্টিফাইড কপি হাতে পেয়ে শীঘ্রই প্রতিকার এর জন্য দুদকের স্মরনাপন্ন হবো।’
এ বিষয়ে নামজারীর আবেদনকারী মো: আবুল হোসেন মোল্লা জানান, ’আমি আমার ৯০ শতাংশ জমির সাফ কবলা দলিল মূলে মালিক। যা ২৩৬/১৭ মামলায় আদালত থেকে আমার পক্ষে একতরফা ডিক্রী হয়। আমি ওই ৯০ শতাংশ জমির জন্য নামজারীর আবেদন করেছি। আদালতের রায়ের কপি এবং অন্য কোন জমির নামজারীর বিষয়ে আমি জানি না।’
এ বিষয়ে মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো: রফিকুল ইসলাম-১ জানান, ’আদালতের রায় এবং সরেজমিনে জমির দখল দেখে নামজারীর জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে সদ্য বিদায়ী (বর্তমানে যশোর জেলার বাঘারপাড়ায় কর্মরত) কলাপাড়া সহকারী কমিশনার এএফএম আবু সুফিয়ান জানান, ’নামজারী কেস-৭২৬/১৮-১৯ তহশিলদারের সরেজমনি তদন্ত প্রতিবেদন এবং কানুনগো এর স্বাক্ষরের পর আমি উক্ত জমা খারিজ প্রস্তাব অনুমোদন করেছি।’
কলাপাড়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) অনুপ দাশ জানান, ’সংক্ষুব্ধ পক্ষ এটির বাতিল চেয়ে ১৫০ ধারায় দরখাস্ত করেছে, যা উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে শুনানীর পর আদেশ দেয়া হবে।’
কলাপাড়া ইউএনও মো: তানভির রহমান জানান, ’নামজারীর দরখাস্তে আবেদনকারী প্রয়োজনীয় সকল কাগজ পত্র সংযুক্ত করেছে। এর দায়ভার আবেদনকারীর। তবে মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী রফিকুল ইসলাম’র বিরুদ্ধে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন তিনি।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here